ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হলেও টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে (ঠিকাদার নিয়োগ না দিয়ে) চরম দূর্ণীতির আশ্রয় নিয়ে অদৃশ্য ইশারায় আউটসোর্সিংয়ের ৬২জনকে নিয়োগ দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আবার নিয়োগের ক্ষেত্রেও নেওয়া হয়েছে কুটকৌশল, ৬২ জনের কাউকেই নিয়োগপত্র না দিয়ে, বেতন-ভাতা না জানিয়ে শুধুমাত্র শিফটিং ডিউটি ভাগ করে দিয়ে কাজে যোগদান করতে বলা হয়েছে। উপায় না পেয়ে অনেকটা বাধ্য হয়ে কোন রকম হাজিরা ছাড়াই কাজ করছে ৬২জন আয়া, ক্লিনার, ওয়ার্ডবয় সহ ১২টি পদের বিপরীতে যোগদানকারিরা।তবে এ বিষয়ে মুখ খুলতে নারাজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

অপরদিকে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে কাঙ্খিত পদের বিপরীতে জনবল নিয়োগ দেওয়ায় এবং মাসের পর মাস লক্ষ লক্ষ টাকার পে-অর্ডার আটকে থাকায় আর্থিক ক্ষতিসহ চরম হতাশায় দিন পার করছেন টেন্ডারে অংশগ্রহনকারি ঠিকাদাররা।

সরেজমিনে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায় সেখানে আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত হিসেবে কাজ করছে ওয়ার্ডবয়, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ওটিবয়, স্ট্রেচার বেয়ারার,নিরাপত্তা প্রহরীসহ ১২টি পদের বিপরীতে যোগদানকারিরা

সার্জারী ওয়ার্ডে (পুরুষ) ওয়ার্ডবয় হিসেবে কাজ করা আহসান হাবীব এর কাছে নিয়োগ সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রথমে তিনি কাজের ব্যস্ততা দেখিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চান, পরে তার ব্যস্ততা কমলে সে জানায়, সে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে চলতি বছরের ২৬ মার্চ থেকে কাজ করছে।তবে কোন ঠিকাদার তাকে নিয়োগ দিয়েছে, ঠিকাদারের নাম কি, এসব কিছুই বলতে পারেনি সে।

ওয়ার্ডবয় হিসেবে একই সময়ে যোগদান করা দিলীপ কুমার ও নিত্য রায় জানায়, তারা আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে গত ২৬ মার্চ থেকে কাজ করছে। কে তাদের যোগদান করালো এমন প্রশ্নে তারা জানায়, হাসপাতালে ৬২ জনের লিস্ট বের হয়,সেখানে তাদের নাম ছিলো।এছাড়া হাসপাতালের তত্বাবধায়ক তাদের ফোন করে যোগদান করতে বলে। ৬২ জনের লিস্ট কোন ঠিকাদার করেছে জানতে চাইলে তারা একটু নিচু স্বরে জানায় ওই লিস্ট এমপি রমেশ সেনের, উনিই লিস্ট করে দিছেন ৬২ জনের নাম। তাদের বেতন কত নির্ধারণ করা হয়েছে জানতে চাইলে তারা জানায় সঠিক জানি না, তবে ১৪-১৫ হাজারের কথা শুনেছি। নিয়োগে টাকা-পয়সা লেনদেন কত হয়েছে-জানতে চইলে বিষয়টি এড়িয়ে যান তারা। এদিকে অনুসন্ধান করে দেখা যায়, সভাপতির কার্যালয়, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ, শেরে বাংলা নগর, ঢাকা নামীয় প্যাডে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন এর গত ৩১.১২.২০ ইং তারিখের স্বাক্ষরিত সুপারিশ পত্রে দিলীপ কুমার ও নিত্য রায়কে নিরাপত্তা প্রহরী পদে উল্লেখ করা হলেও তারা কাজে যোগদান করে ওয়ার্ডবয় হিসেবে। এ বিষয়ে তাদের যোগ্যতা রয়েছে কি না সে বিষয়টিও সন্দিহান!

এ বিষয়ে জানতে হাসপাতালের ওয়ার্ডমাস্টার ফিরোজ জামান এর সাথে দেখা করলে তিনি জানান, নিয়োগ/বদলী সবকিছুই উর্ধতনরা করেন।আমার কাজ শুধু রোস্টার ডিউটি ভাগ করে দেওয়া।এমপি মহোদয়ের সুপারিশকৃত ৬২জনের তালিকা আমাকে হাসপাতাল তত্বাবধায় প্রদান করলে আমি তাদের ডিউটি ভাগ করে দেই-এছাড়া আউটসোর্সিংয়ের ঠিকাদার কে বা টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে কি না, এসব আমি কিছুই জানি না। এদিকে আউটসোর্সিংয়ে অংশ নেওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আল আরাফাত সার্ভিসেস লিমিটেড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বেলায়েত হোসেন অভিযোগ করে বলেন, আমি আমার ঠিকাদারি জীবনে এমন অনিয়ম-দূর্ণীতি কোথাও দেখিনি। আউটসোর্সিংয়ের ঠিকাদার নিয়োগের আগে কেমন করে জনবল নিয়োগ হয়? হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই যদি জনবল নিয়োগ দেবে তাহলে এ টেন্ডার প্রক্রিয়া কার স্বার্থে? টেন্ডার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন অনিয়ম তুলে ধরে হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ও সিভিল সার্জন বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছি-যদি সঠিক মূল্যায়ন না হয় তাহলে আদালতের দ্বারস্থ হবো।

টেন্ডারে অংশ নেওয়া আরেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আল-ওয়াফা’র স্বত্তাধিকারি মো: জাহিদ হাসান জানান, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগে দরপত্র আহ্বান করা হয় ডিসেম্বর মাসে। সেই থেকে বিভিন্ন ঠিকাদারের লক্ষ লক্ষ টাকার পে-অর্ডার সেখানে আটকে আছে। উন্মুক্ত দরপত্রে কোন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পেলো,তার দরপত্রের দর কি ছিলো, কিছুই জানানো হয়নি-অথচ শুনছি জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কন্ট্রাক ক্লিনিং সার্ভিসেস লি: এর পরিচালক মো: ওবায়দুর ইসলাম বলেন, হাসপাতালের আউটসোর্সিংয়ে জনবল নিয়োগের দরপত্র প্রক্রিয়ায় যেসকল অনিয়ম হয়েছে তা সাহেদ-সাবরিনাকেও হার মানায়। বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি নওগাঁ পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ড বিএনপি’র সভাপতি মো: আশরাফুল ইসলামের ‘শারমিন ট্রেডার্স’কে আউটসোর্সিংয়ের ঠিকাদার নিয়োগের পায়তারা চলছে। যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কি না এর আগে এই হাসপাতালের কাজ পেয়ে কর্মীদের ব্যাংক এ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বেতন প্রদান না করে, নিয়মিত বেতন না দিয়ে ৬ মাস পর পর হাতে হাতে বেতন প্রদান করেছে।

আউটসোর্সিংয়ের টেন্ডার প্রক্রিয়া কি পর্যায়ে রয়েছে জানতে চাইলে টেন্ডার সংক্রান্ত কোন বিষয়ে কথা বলা নিষেধ রয়েছে বলে জানান হাসপাতাল তত্বাবধায়ক ডা: নাদিরুল আজিজ চপল। তবে আল আরাফাত সার্ভিসেস লি: নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগের কপি তিনি পেয়েছেন জানিয়ে বলেন, এ বিষয়ে টেন্ডার কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অভিযোগপত্রে যে সমস্ত অভিযোগ আনিত হয়েছে সে বিষয়গুলি আমরা বিবেচনায় নিয়েছি।তবে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে কিভাবে জনবল নিয়োগ দেওয়া হলো জানতে চাইলে এর কোন সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

এ বিষয়ে জানতে জেলা সিভিল সার্জন ডা: মাহফুজার রহমান সরকার এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার কার্যালয় হতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ৩২জন জনবল নিয়োগে যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিলো তা যাচাই-বাছাই শেষে অনুমোদনের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে, এখনো কোন জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তবে তত্বাবধায়কের কার্যালয়ে আউটসোর্সিংয়ের ঠিকাদার নিয়োগের আগে ৬২ জন জনবল নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

Leave a Reply